কখনো ভেবেছ? Hevenly body গুলো কেন সবসময় গোলাকারই হয়?








বেশ কিছু দিন আগে (আসলে ২০১৬ সালে) এক ফেসবুক গ্রুপে একজন প্রশ্ন করেছিলেন “সৌরজগতের বেশিরভাগ গ্রহ-উপগ্রহ গুলো গোলাকার কেন ?” প্রশ্ন টি খুব সুন্দর ছিল এবং ভাবার মত ছিল। কমেন্ট করে একজন যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং সোজা উত্তর দিয়েছিল তা হল, “বস্তু গুলোর অনুগুলো মহাকর্ষ বলের টানে নিজেদের মধ্যে যতটা কাছে পারা যায় সজ্জিত হয়েছে যা একটি গোলক এর আকার নিয়েছে”

এই উত্তরটা ফ্লুয়িড বডি (Fluid Body) যেমন সূর্য বা বৃহস্পতি গ্রহের ক্ষেত্রে সুন্দর কাজ করে, কিন্তু সলিড বডি এর ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটি তত সহজ নয়। কেননা আমারা সবাই দেখেছি ছোট পাথর গুলো গোলাকার হয় না। অবশ্যই পাথরের অণুগুলোর মধ্যেও মহাকর্ষ বল কাজ করছে, কিন্তু তা যে গাঠনিক বল পাথরের গঠন টাকে ধরে রেখেছে তার চেয়ে শক্তিশালী না।

যেহুতু মহাকর্ষ বল বস্তুর আকারের সাথে বৃদ্ধি পায় তাহলে ভাবার বিষয় হচ্ছে মহাকর্ষ বল কে গাঠনিক বলের চেয়ে কত বড় হতে হবে যেন কোন পাথরের খন্ড গোলাকার হয়? আবার International Astronomical Union (IAU) এর গ্রহ হওয়ার শর্তানুযায়ী “একটি মহাজাগতিক বস্তু কে যথেষ্ট ভর সম্পন্ন হতে হবে যাতে সে নিজের মহাকর্ষ বল দ্বারা গোলাকার রুপ ধারন করতে পারে”

তাহলে একটি পাথরখন্ড কে কত বড় হতে হবে গ্রহ হওয়ার মর্যাদা লাভের জন্য?? প্লুটো এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কি?

আমরা এই প্রশ্ন গুলো উত্তরই খুঁজার চেষ্টা করব এখন।



মৌলিক ধারনা:



ধরি, একটি বর্গাকার বস্তু (Cube) মাটিতে রাখা হলে সে 98 Pa চাপ প্রদান করে। এখন কিউবটার ভর এবং আকার বাড়ানো হলে, সে অনুপাতে সে মাটিতে চাপ প্রদান করবে। কিউবটি কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই তার আকার ধরে মাটিতে সেই চাপ দিতে পারবে। তুমি যত ভর বাড়াবে, চাপ বৃদ্ধি পাবে আর কিউবের ধার গুলো বেকে আকার পরিবর্তন হয়ে যাবে। তাহলে যে গাঠনিক বল কিউবকে তার আকার রক্ষা করে Stable থাকতে সাহায্য করছিল সেটা চাপ বাড়ার সাথে আর পেরে উঠতে পারবে না। কম চাপে Hooke’s Law অনুযায়ী কিউবটি হয়ত বিকৃত হয়ে আবার পুনরায় আগের গঠন ফিরে পেতে পারবে কিন্তু সীমার বাইরে গেলেই আনবিক গঠন ভেঙ্গে যাবে এবং কিউবটি তার চিরচরিত আকার হারাবে। এই প্রান্তিক সীমা কে বলে Compressive Strength। তাহলে স্বাভাবিক ভাবে কিউবটি কত বড় হলে বা এর এক বাহুর দৈর্ঘ্য কত হলে compressive strength, কিউবের তলার সেই চাপ কে টেক্কা দিতে পারবে?



একটি পাহাড়ের সর্বোচ্চ উচ্চতা কত হতে পারে??



আচ্ছা এবার আমরা আগে আরেকটি প্রশ্নের উত্তর খুজে বের করার চেষ্টা করি। পাহাড়ের তলদেশে অবস্থা অনেক শোচনীয় হয় এত ভরের জন্যকারন পাহাড়ের সব পাথরগুলা পাহাড়ের Base এ প্রচুর চাপ প্রয়োগ করে। পাহাড়ের ভর ধরে রাখতেও সেই কিউব এর মতই তার তলদেশ যথেষ্ট শক্ত হতে হবে। পাহাড় তো আর বর্গাকার না তাই আমরা এখন পিরামিডাকার ধরে কিছু কাজ করব। যেমনটা নিচের ছবিতে আছে,



আমরা জানি, পিরামিড এর আয়তন, $V= \frac{1}{3} A_{base} H$

সুতরাং পাহাড়ের তলে চাপ,
$P=\frac{W}{A}=\frac{Mg}{A_{base}}=\frac{ρVg}{A_{base}}=\frac{ρ(\frac{1}{3}A_{base}H)g}{A_{base}}$

$P=\frac{ρHg}{3}$

এখানে পিরামিডাকার পাহাড়ের তলদেশের চাপের ক্ষেত্রে একটি সংশোধন করা যায়। যেহুতু পাহাড়গুলি একটিমাত্র পাথরের তৈরি সমসত্ত্ব ঘনত্বের না সেহুতু তলদেশেও চাপের বিভিন্ন জায়গা অনুযায়ী আলাদা হবেই। বিশেষত তলদেশের ধার গুলোতে। পাহাড়ে অনেক ধরনের পাথর আর শিলা আছে যাদের ঘনত্ব বিভিন্ন কিন্তু পাহাড়ের তলদেশে যে সর্বোচ্চ চাপ প্রযুক্ত হওয়া সম্ভব তা আমাদের বের করা মানের দ্বিগুণ হবে ধরে নেওয়া যাবে (ডাটা থেকে বলা যায়) ।

তাহলে আমরা পাই, $P =\frac{2ρHg}{3}$

এখন পাহাড়টি তার আকার বজায় রাখতে পারবে যদি, $P = \frac{2 ρΗg}{ 3}$ ≤ Compressive Strength

উচ্চতার জন্যে সমাধান করলে, $H$ ≤$\frac{3CS}{2ρg}$

আমারা এই সমীকরণে বেশ কিছু সম্পর্ক লক্ষ্য করতে পারছি যেমন উচ্চতা, অভিকর্ষজ ত্বরণ এর ব্যাস্তানুপাতিক।

এখন সুত্র প্রয়োগের পালা! মঙ্গল গ্রহ নিয়েই ভাবা যাক! মঙ্গল গ্রহের অভিকর্ষজ ত্বরণ পৃথিবীর $0.38$ গুন সেহুতু মঙ্গল গ্রহে পাহাড়ের সর্বোচ্চ মান হবে (CS এবং ঘনত্ব একই ধরে) $\frac{1}{0.38} = 2.63$ গুন পৃথিবীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানের।

এখন আমরা সৌরজগতের সর্বোচ্চ উচ্চতার পাহাড় এর সাথে আমাদের প্রাপ্ত ফলাফল মিলিয়ে দেখি। Mt. Olympus Mons এরই উচ্চতা $24 km$ মঙ্গলের পৃষ্টের আদর্শ উচ্চতা থেকে। পৃথিবীর ক্ষেত্রে তুমি হয়ত ধরবে Mt. Everest কে । কিন্তু এর চেয়েও একটি পর্বত আছে পৃথিবীতে যা আরও উঁচু। এটা সহজে ধরা পরে না কারণ বেশিরভাগটাই পানির নিচে। Mauna Kea সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে $10.2 km$ উঁচু। এখন এই $২$ টি সর্বোচ্চ উচ্চতার পর্বত আমাদের উচ্চতার অনুপাত দেয় $2.35$। দেখেছ মানটা খুব খারাপ না!!! এই সুত্র দিয়েই একদম আসল উচ্চতা বের করে ফেলা যেত যদি আমরা ঘনত্ব আর Compressive Strength একি না নিয়ে আসলটা ধরতাম!!

পৃথিবীতে Mauna Kea এর মত পর্বত গুলা সচারচর আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock) দিয়ে তৈরি হয় যাদের ঘনত্ব হয় $\frac{3000kg}{m^3}$ এবং CS হয় প্রায় $200 MPa$।

এখন অভিকর্ষজ ত্বরণ $9.8 \frac{m}{s^2}$ ধরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতার পর্বতের উচ্চতা আসে ≅$10 km$! একি ভাবে মঙ্গল গ্রহের জন্য কম অভিকর্ষজ ত্বরণ নিয়ে আসে ≅$26 km$ । আমাদের সুত্রে যতটা $Error$ আছে সে তুলনায় আমাদের প্রাপ্ত মান গুলা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার !!



তাহলে গ্রহ গুলা গোল কেন ?



অনেকেই হয়ত এতখানি পড়ে ভাবছো যে পাহাড়ের উচ্চতা নিয়ে এত কাহিনি করছি কেন তাইনা? আসলে একটু ভাবলেই বুঝতে পারবে কোন গ্রহে পাহাড় আর পৃষ্ঠের কোন জায়গার উচ্চতায় সামগ্রিক ভাবে গ্রহের বর্তুলতা নির্ধারন করছে! পৃথিবীর জন্য আমরা দেখলাম সর্বোচ্চ উচ্চতা হতে পারে $10km$ যেখানে আমাদের পৃথিবীর ব্যাসার্ধ $6400km$। তারমানে সাম্ভাব্য সর্বোচ্চ উচ্চতা পৃথিবীর ব্যাসার্ধের তুলনায় অন্নেক ছোট যা দূর থেকে দেখতে মসৃণ এর মতই লাগবে! তাহলে প্রশ্ন আসেই $Celestial Body$ এর পৃষ্ঠ কে কতটা মসৃণ হতে হবে গোলাকার দেখাতে হলে গ্রহ কে?

জ্যামিতিক ভাবে বলা হয় যে পৃষ্ঠ কে ব্যাসের $10%$ এর মধ্যে থাকলে একটি বস্তুকে গোলাকার বলা যাবে!! খুব বড় মনে হলেও আসলে দূর থেকে আপাত ভাবে গোলই মনে হয়।

আমাদের গ্রহনকৃত শর্ত থেকে এখন সেই পাহাড়ের সর্বোচ্চ উচ্চতার সূত্রটি দাড়ায় ,

$H_{max} =\frac{3(CS)}{2ρg}$ ≤$\frac{R}{5}$
CS=Compressive strength

এখন উচ্চতা ব্যাসার্ধের সাথে সম্পর্কিত আবার অভিকর্ষজ ত্বরণ $g=\frac{GM_{planet}}{R^2}$

এখন, $H_{max} =\frac{3(CS)R^2}{2ρGM_{planet}}$ ≤$\frac{R}{5}$

আবার , $H_{max} =\frac{3(CS)R^2}{2ρGρ\frac{4}{3}πR^3}$ = $ \frac{9(CS)}{8πGρ^2} R$ = ≤$\frac{R}{5}$

যেহুতু $M=ρ V=ρ\frac{4}{3} πR3$

শেষে সর্বনিম্ন ব্যাসার্ধ, $R$ ≥ $sqrt(\frac{45(CS)}{8πρ^2G})$

একটি বস্তুর জন্য যা আগ্নেয় শিলার তৈরি ($CS=200 MPa$ & $ρ = 3000kg/m^3$ ) আমরা পায় কোন গ্রহের সর্বনিম্ন ব্যাসার্ধ হয় $770 km$। এটা সৌরজগতের আসল বস্তুগুলোর সাথে কতটা তুলনাযোগ্য?? এই আকারটা আসলে বৃহত্তম গ্রহাণুর পর্যায়ে পরে Ceres যা সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহাণু এর ব্যাসার্ধ $550 km$, যাকে গোলাকারই মনে হয়! কিন্তু এরপরের গ্রহাণু গুলোর ( Vesta, Pallas ) ব্যাসার্ধ প্রায় $250 km$ যা আমাদের সংজ্ঞানুযায়ী গোলাকার না!








প্লুটোর সম্পর্কে আমরা কি জানি ? তার চাঁদ চেরন এর কক্ষপথ থেকে আমরা বের করতে পারি প্লুটো এর ভর এবং ঘনত্ব। প্লুটো এর ব্যাসার্ধ $1195 km$, ভর $1.25×1022$ কেজি এনবং গড় ঘনত্ব $1750 kg/m^3$। ধরা হয় প্লুটোতে বরফ আছে $৭০%$ তাই যদি বরফের compressive strength $10Mpa$ হয় তাহলে আমাদের সুত্র বলে প্লুটোতে পাহাড়ের উচ্চতাটা দাড়ায় $14.7 km$, তার নিজের ব্যাসার্ধের $1%$ এর কিছু বেশি । তাই প্লুটো কে গ্রহের উপাধি দেয়া যায় । কিন্তু সে এই শর্ত টা পূরণ করলেও গ্রহ হওয়ার বাকি শর্ত পূরণ করতে পারেনি $২০০৬$ এ $IAU$ এর গ্রহের নতুন সংজ্ঞানুযায়ী । প্লুটোর কক্ষপথে আরো অনেক কুইপার বেল্ট অবজেক্ট এর অবস্থান আছে যার ফলে তার নিজস্ব কক্ষপথের স্বাধীনতা নেই । তাই সে বামন গ্রহ উপাধি পেয়েছে !



তাহলে?



আমরা দেখলাম সৌরজগতের যেসব বস্তু গুলোর ভর যথেষ্ট আছে এবং ন্যুনতম ব্যসার্ধ $770$ কিমি. এর কাছাকাছি আছে তাদের আকার আসলে আমরা গোলাকার (Spherical) দেখি আর আমাদের পর্যবেক্ষনে আসলে এই বস্তুগুলোই থাকে কিন্তু সংখ্যাগত ভাবে non-spherical celestial object এর পরিমাণই আমাদের সৌরজগতে বেশি !

আশা করি ধৈর্য্য নিয়ে এতক্ষন যারা পুরোটা পড়লে তারা নতুন কিছু শিখতে পারবে । লক্ষ্য করবে এখানে কিন্তু খুব কঠিন কোন অঙ্ক করতে হয়নি । স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্যই লেখা ,আসলে $Astronomy$ খুব একটা কঠিন না বরং মজার বুঝতেই পারছ ।

এখানে আমি Sir Steve Heilig এর একটি লেখার সাহায্য নিয়েছি ।


Writer: Fahim Rajit Hossain
Team Leader: IOAA 2018